ক্লাস নাইনে পড়ার সময় হঠাৎ মাথায় ভ‚ত চাপলো, ছড়া সংকলনতো বহু হলো; এবার পোস্টকার্ডে গল্প লেখা আহ্বান করলে কেমন হয়! এরপর সারাদেশ থেকে পোস্টকার্ডে বিচিত্র সব কাহিনীতে ভরপুর, প্রচুর গল্প এসেছিলো।
ভার্সিটিতে বাবা তার ছেলেকে পোস্টকার্ডে লিখতেন অধিকাংশ সময়েই। আজীবন শিক্ষক আর মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক বাবার ইংরেজিতে লেখা, সেসব পোস্টকার্ডে থাকতো কত তথ্য ও ইতিহাস, আবেগ-উদ্বেগ আর অনুভ‚তি। থাকতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সতর্ক বাণীর পর সমর্থন দান এবং পরামর্শ ও সাহস। শেষে থাকতো মায়ের আশির্বাদের কত কথা।
ঐসব পোস্টকার্ডের উত্তরে ব্যাকরণগত ভুল-ভ্রান্তি আর বাক্যের বিভিন্ন শব্দের ক্ষেত্রে আন্ডারলাইন করে যথাযথভাবে যা হবে, ফেরৎ ডাকে আবার লিখে পাঠাতেন বাবা।
জলপাই শাসনের উত্তাল দিন রাত আর একাত্তরের শকুন-শাবকদের নাচন-দাপাদাপি, সময়ের অসহায়ত্ব এবং শিকল বাঁধা যাপন, হাটে মাঠে ঘাটে কর্মব্যস্ত জীবন আর কৈশোরের বিচিত্র কিছু সত্য বিষয় নিয়ে ছোট ছোট গল্প লেখার চেষ্টা করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমান সেলিম তার পরিশ্রম আর মমতা মাখানো কলমে তুলে ধরেছেন সমাজের কিছু না বলা ক্ষত-কিছু মানুষের অপকীর্তি-তাদের কদর্য চেহারাকে। পাশাপাশি মাঠের বিচিত্র অভিজ্ঞতার সাথে চরম বাস্তবতা আর পেশার সৌন্দর্য-মাধুর্যকে প্রকাশ করেছেন সুনিপুন হাতে।
আমাদের জীবন যখন গল্প, আর আমরা সবাই ‘গল্পপোষ্য জীব’, তখন বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধানস্থপতি মামুন হুসাইন চারপাশে খুঁজতে শুরু করেন ‘গল্পদেখার চিহ্ন’। গল্প-উপন্যাসের বাইরে এই গল্প দেখার চোখ দিয়ে আমরা আমাদের ভয়, আকাক্সখা, উদ্বেগ ও স্বস্তি খোঁজার নতুন উপায় খুঁজে পাই। ব্যক্তিগত গদ্য অথবা বেললেট্র নামক এই রচনাপঞ্জীতে ছড়িয়ে থাকে জগত সংসারের বিবিধ চিহ্ন, খোলনলচে এবং দূরাগত নক্ষত্রের উজ্জ্বল আভাষ!
গল্প দেখার ছলে তখন আবিষ্কৃত হয় জীবন-যাপনের নানান রহস্য, মায়া, ক্ষয়, বিষণ্যতা, আঁধার এবং তীব্র এক ছায়া-আলোর প্রক্ষেপণ। এই ছায়া-আলো পথ ধরে ব্যক্তিজগতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় আবিষ্কৃত হলেও অচিরেই এখানে ব্যক্তি মানুষের দ্রোহ ও যাতনা হয়ে যায় আমাদের সামষ্টিক অনুধ্যানের নমুনা, আমাদের সামষ্টিক অবলোকনের চিহ্ন এবং বেঁচে থাকার অকথিত দ্যোতক। ‘কথা ইশারা’র মত এই গ্রন্থটিও তাই হয়ে ওঠে আমাদের বিবিধ সময় বর্ণনার এক উজ্জ্বল সঙ্গীতময় গদ্যপ্রতিভা, এক সংসিদ্ধ সংবেদ।